About Me

header ads

বাই চান্স বাঁচবো, না পারলে মরার আগে বেঁচে নেবো!

ডেস্কও ওয়েব ডেস্কঃ জুতোর দোকানের ভিড়ের ছবিটা দেখেছেন? থিকথিকে ভিড় দেখে আঁতকে উঠেছেন? সেই ছবি যদি না ও দেখেন, রাস্তায় ঘাটে মাছের বাজারে গাদাগাদি অবশ্যই দেখেছেন। মাস্ক ছাড়া হাজারো পাবলিক রোজ দেখছেন। দেখছেন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাবার দৃশ্য। রোল থেকে বিরিয়ানি আবার আগের রোলে অভিনয় করছে স্বমহিমায়। দেখে আঁতকে উঠছেন। এরা কারা?  এতোটুকু চেতনা নেই! এতো প্রচার এতো মৃত্যুর পরেও!

হ্যাঁ মৃত্যুভয় এদেরও আছে। বাস্তবের জমিতে জীবনের লড়াই লড়তে লড়তে তারা বাস্তবকে চিনে নিয়েছে হাড়ে হাড়ে। তারা বুঝে নিয়েছে করোনা নিয়েই ঘর করতে হবে।একসময় তারা সত্যিই ভয় পেয়েছিল। তারা দেখেছিল ইটালির মাঠ জুড়ে হাসপাতালের ছবি, শুনেছিল উজাড় হয়ে যাবার গল্প। ভরসা করেছিল লকডাউনে। ভেবেছিল কটাদিন পেটে কিল মেরে ঘরে বসে থাকবে, তারপর আবার সব স্বাভাবিক হবে। তারপর কেটে গেল অনেকগুলো দিন। দেখল কোনও অজ্ঞাত কারনে খুলে গেল মদের দোকান, ফুল মালা মিষ্টিরা কিভাবে যেন হয়ে গেল অত্যাবশ্যকীয় পন্য। খুলে গেল সব, উপচে পড়লো ভিড়। শুধু খুলল না গন পরিবহন, তাদের জীবিকার দরজা এঁটে জীবন বাঁচানোর গল্প শোনাচ্ছে সবাই। পেট তো শুধু সচেতনতার গল্পে ভরে না। খাবে কি? করোনা এলো ঘরের দরজায়।

অভিজ্ঞতায় তারা দেখল যা ভেবেছিল, তেমন কিছু না। রাষ্ট্রের ২০ লক্ষ কোটির তহবিলের গল্প শুনেছিল, হাজার হাজার ট্রেনে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার হবার কাহানি শুনেছিল, স্টেডিয়াম জুড়ে হাসপাতাল হবার কথা শুনেছিল, সোস্যাল মিডিয়াতে জুনেই দেশে ২৫ কোটি আক্রান্ত হবার গল্পও শুনেছিল। বাস্তবে দেখলো কিছুই হলো না। সব দেখে তারা বুঝে নিল করোনা অতিমারি কিনা জানা নেই, তার থেকেও বড় মহামারী পেটের ভিতর, ঘরের ভিতর, তার নাম খিদের জ্বালা, তার নাম অভাবের তাড়না। পথে নামতে হল তাদের। সব খুলে গেল, কিন্তু ট্রেন আর চলে না। বাইক বা সাইকেল নিয়ে ৩০/৪০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হচ্ছে কাজের জন্য। মাস্ক, সে তো যাতনা। সাইকেল চালানোর সময়, মাল বহনের সময় মাস্কে করোনা আটকায় কিনা জানা নেই, তবে দম আটকে আসে বিলক্ষণ। আবার যারা ৬টার সময় বেরিয়ে কাজে যাচ্ছে, তাদের বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আর শুকনো মুড়িতে দিন কাটে না। কে দেবে কোভিড প্রটোকল মেনে খাবার? ভরসা সেই রাস্তার দোকান। মানুষ নিরুপায়। ওখানেই খেতে হবে। অবস্থা সেই গল্পের মতো, মন্দিরের দিকে পা করে শুয়ে থাকা সন্ন্যাসীকে যখন বলা হল ভগবানের দিকে পা করে শুয়ো না, সে বলল, বলে দাও কোন দিকে ভগবান নেই, সেদিকেই পা করে শুই। এখানেও তাই, করোনা সব দিকে। ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তায় থাকা অমিতাভ, প্রনব বাবু, অমিত শাহেরা যখন করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন, তখন সাধারন মানুষের কি করার আছে? তারা কি করে মানবে সব? দোকানে হাজার মানুষের ভিড়ে স্যানিটাইজার দেবার সময় কই? সেই হাতেই জিনিস দেখানো, টাকা গোনার ফাঁকে ঘাম মুছে নেওয়া। রাস্তার দোকানে যে হাতে পয়সা নিচ্ছে, সেই হাতেই দিচ্ছে খাবার। উপায় কি? যা হবে দেখা যাবে। যাদের মাইনেতে হাত পড়েনি, যাদের কাজ কারবার ঠিকঠাক চলছে তাদের কাছে যা সতর্কতা, ওই খেটে খাওয়া মানুষের কাছে তা আসলে বিলাসিতা। সেই বিলাসিতার সুযোগ তাদের নেই!

তারপরেও প্রশ্ন থাকে, প্রয়োজনের কথা বুঝলাম। কিন্তু এই উৎসব, এই ফুচকার দোকানে লাইন, এই গাদাগাদি করে কেনাকাটা, এসবের কি খুব দরকার ছিল? প্রানের ভয় নেই ওদের? কান পাতুন, শুনতে পাবেন, ওরা বলছে, যে মৃত্যু ভয়ে তোমরা মরে যাচ্ছ, তার দশ গুন মৃত্যু ভয় নিয়ে আমরা বাঁচি রোজ। আজ তোমাদের হাসপাতালে বেড নেই, আমাদের হাসপাতালে বেড কোনদিনই ছিল না। তাই বেড না পাওয়ার নতুন কোনও ভয় আমরা পাই না। ট্রেনে গাদাগাদি করে গেটের কানায় পা দিয়ে মৃত্যুকে সাথে নিয়ে ঝুলতে ঝুলতে গেছি রোজ, তাতেই অভ্যস্ত হতে হয়েছে নিরুপায় হয়ে। আজ রোগের ভয় দেখাচ্ছ?  রোজ সন্ধ্যেবেলা টিভি খুললেই, প্লাস্টিক, পোড়া তেল, মোবাইল, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, রঙিন খাবার সবেতে ক্যানসারের গল্প শুনেছি, আর ভয় করেছি রোজ। মাছে ফরমালিন, মুরগির মাংসে অ্যান্টিবায়োটিক, সবজিতে রঙ, নুডুলসে সিসা, মিনারেল ওয়াটারে ক্লোরিন, রেস্তোরায় ভাগাড়ের মাংস, দুধে শ্যাম্পু আমরা রোজ খেয়েছি। সব জানার পরেও খেতে বাধ্য হয়েছি। একটু তাজা বাতাস চেয়েছি, মুখের ওপর কালো বিষ ধোঁয়া ছেড়ে গেছে ইঞ্জিন ভ্যান।

আজ আমরা নীলকণ্ঠ। সবাই দেখেছে সেসব খবর, কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। দেশ পরোক্ষভাবে জানিয়ে দিয়েছে এদেশে থাকলে এভাবেই থাকতে হবে। সতর্কতায়, আশঙ্কায় চোখ বুজে থাকতে হবে, ওসব দেখতে নেই, ওসব নিয়ে ভাবতে নেই। এভাবেই থাকছি আমরা। এতোদিন সবকিছু ভাগ্যের হতে ছেড়ে দিয়ে বাই চান্স বেঁচে এসেছি, না পারলে টুপ করে মরে গেছি। আজও বাই চান্স বাঁচবো, না পারলে মরার আগে বেঁচে নেবো। যতক্ষণ গন্ধ পাচ্ছি, নতুন জুতো জামা এগরোলের গন্ধ নেবো। পুজো দেখবো, হল্লা করবো, ভিড় করবো, বাজার করবো। সরকার যেমন ভাবে চালিয়েছে, সব কিছুতে চোখ বুজে, আমরাও আজ সব সতর্কতায় চোখ বুজে থাকবো। এটাও বোধহয় এক ধরনের প্রতিবাদ। আজ সবাই শ্রীকান্তর ইন্দ্রদা, মরতে তো একদিন হবেই ভাই, এটাই তাদের ট্যাগলাইন। তাই বিস্ময়ের কিছু নেই। পুজো চলুক, দানছত্র চলুক, কেনাকাটা চলুক, ভিড় চলুক, মহামারীও চলুক।

আমি, আপনি একে সমর্থন করি আর না করি, এটাই বাস্তব, এটাই ভবিতব্য। এটাই ভারতবর্ষ। দোষ করো নয় গো মা, আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরেছি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য