About Me

header ads

"কেউ প্রস্তাব দিত না, দিলেও রাজ্যসভায় যেতাম না": দীপক গুপ্তা

কেউ তাঁরা কাছে প্রস্তাব নিয়ে যেত না বটে, তবে গেলেও তিনি রাজ্যসভার সদস্যপদ গ্রহণ করতেন না। বুধবার অবসর গ্রহণের পর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কাছে এভাবেই নিজের মনোভাব ব্যক্ত করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপক গুপ্তা। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি, বলেছেন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান যা ছিল তার চেয়ে ভাল হতে পারত, ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সাংবাদিক সম্মেলন ভাল ব্যাপার ছিল না, এবং অনেক অর্থযুক্ত মামলা ও নামি আইনি সংস্থা তালিকায় অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে।

অবসরগ্রহণের আগে সুপ্রিম কোর্টের কিছু বিচারপতি সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা অবসরগ্রহণের পর সরকারি চাকরি করবেন কিনা। এ ব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
আমি সরকারের কোনও প্রস্তাব গ্রহণ করব না। কিছু ট্রাইব্যুনাল রয়েছে যেখানে আইনগত ভাবেই প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের থাকতে হয়। কিন্তু সেসব পদ আমার জন্য নয়। স্বল্প সময়ের জন্য কোনও কার্যভার গ্রহণ করা ও সরকারি কমিটির মাথা হয়ে বসার মধ্যে ফারাক রয়েছে। এটা আমার বিচারবিভাগীয় ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি।

রাষ্ট্রপতির দ্বারা রাজ্যসভায় মনোনীত হওয়া, যেমনটা প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের ক্ষেত্রে ঘটেছে, তাকে কি আপনি অবসরের পর সরকারি চাকরির প্রস্তাব বলে গণ্য করেন?
আমার দিক থেকে তাই। আমি হলে গ্রহণ করতাম না। যদিও আমার ধারণা আমার কাছে কেউ এরকম প্রস্তাব নিয়ে আসতই না।

বিচারপতি গগৈ বলেছেন তিনি আমলাতন্ত্র ও বিচারবিভাগের মধ্যে সংসদে সেতু হিসেবে কাজ করবেন। আপনার মন্তব্য কী?
আমলাতন্ত্র ও বিচারবিভাগের মধ্যে সেতু ইতিমধ্যেই রয়েছে। প্রধান বিচারপতিই সেই সেতু। আমি যথন হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলাম আমি বিভিন্ন বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করেছি।

সমালোচনা অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে আপনি বরাবরই সরব থেকেছেন, এবং বলেছেন সমালোচনা বা আপত্তির ঊর্ধ্বে কেউই নয়। ২০১৮ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতিদের   যে বিরোধিতামূলক সাংবাদিক সম্মেলন, তাকে আপনি কী চোখে দেখেন?
যে সময়ে এটা ঘটেছিল, আমি তখন দিল্লিতে ছিলাম না, বিদেশে ছিলাম। কিন্তু আমি যখন বিষয়টা জানতে পারি, তখন বিব্রত হই। সংবাদমাধ্যমের কাছে যাওয়ার বিষয়টা ঠিক ছিল না এবং প্রতিষ্ঠান সর্বদাই ব্যক্তির চেয়ে বড়। আমার ব্যক্তিগত মত হল ওঁরা (বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, জে চেলেমেশ্বর, কুরিয়ান জোসেফ ও মদন লোকুর) ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই বিষয়টা যতটা সম্ভব সমাধান করতে পারতেন। তবে একই সঙ্গে আমার মনে হয়, সে ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতিকেও সকল বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করার মত মনোভঙ্গি দেখাতে হত।

আপনার মেয়াদকালে বিচারবিভাগীয় কোনও বিতর্কিত বিষয়ে বিচারপতিদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে?
না। কোনও প্রধান বিচারপতিই এরকম কোনও ব্যাপারে সব বিচারপতিদের ডাকেননি। ক্যালেন্ডার তৈরি করা এবং সিনিয়র অ্যাডভোকেট নিযুক্ত করা ছাড়া কোনও ফুল কোর্ট মিটিং হয়ই নি প্রায়। একবার প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র এরকম একটা অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু সে আর ঘটে ওঠেনি।

প্রায় এক বছর হল সুপ্রিম কোর্টের এক কর্মী তৎকালীন প্রধান বিচারপতি গগৈয়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছেন। একটি আভ্যন্তরীণ কমিটি এ অভিযোগের কোনও ভিত্তি খুঁদে পায়নি এবং গগৈকে ক্লিন চিট দিয়েছে। এ ব্যাপারে আদালতের ভূমিকা কী বলে আপনার মনে হয়?
আমি এই মামলার মেরিট নিয়ে বলতে পারব না বা কমিটি কেন এরকম বলেছিল তাও বলতে পারব না। তবে ২০১৯ সালের ২০ এপ্রিল শনিবার সকালে যে শুনানি হয়, (যাতে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা স্পর্শ করার বিষয় ছিল, যে বেঞ্চে বিচারপতি গগৈ সভাপতিত্ব করেছিলেন কিন্তু নির্দেশে সই করেননি) তা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। সহজ ভাষায় বললে, সুপ্রিম কোর্ট এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান ভাল ছিল না।
একটা সমালোচনা ছিল যে ওই কমিটিতে বাইরের কেউ ছিলেন না, সকলেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন। আমি মনে করি না কমিটিতে বাইরের কেউ থাকতেই হবে। আপনাকে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা প্রদর্শন করতেই হবে। কমিটি তার নিজস্ব ধরন অনুসারে কাজ করেছে, ফলে আমি সে নিয়ে মন্তব্য করব না।

এই যৌন হেনস্থার অভিযোগ বৃহত্তর এক ষড়যন্ত্রের অংশ- এ বিষয়ে একটা তদন্ত করছিলেন শীর্ষ আদালতের প্রাক্তন বিচারপতি এ কে পট্টনায়ক। সে রিপোর্টের কি কোনও প্রভাব পড়েছে?
আমি যতদূর জানি রিপোর্ট জমা পড়েছে তবে আমি তা চোখে দেখিনি।

সুপ্রিম কোর্টে কোন মামলায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বা হবে না, সে নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ইলেক্টোরাল বন্ডের মত গুরুত্বপূর্ণ মামলা বছরের পর বছর ধরে তালিকাতেই ওঠে না, কিছু মামলা গৃহীত হয়ে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে চলে যায় কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই। আপনার কি মনে হয়ে এটা একটা ইস্যু?
আমি মনে করি এটা একটা বিষয়। সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত রেজিস্ট্রি পরিচালিত আদালত ফলে রেজিস্ট্রিকে অত্যন্ত চলমান হতে হবে। রেজিস্ট্রাররা বিভিন্ন হাইকোর্ট থেকে আসেন নানারকম অভিজ্ঞতা নিয়ে, কিন্তু তাঁদের পরিচালন দক্ষতা সীমিত। প্রধান বিচারপতি ও রেজিস্ট্রি সব স্থির করেন। এই তালিকাভুক্তির বিষয়ে প্রযুক্তি দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত এবং সেখানে ইচ্ছাধীনতার পরিমাণ ন্যূনতম হওয়া উচিত।
আমি নিজে দেখেছি, যেসব মামলায় বড় পরিমাণ অর্থ এবং নামি ল ফার্ম যুক্ত, সেগুলি আমরা চার সপ্তাহ পর তালিকাভুক্ত করতে বললে, ঠিক চার সপ্তাহ পর তালিকাভুক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে যেসব মামলায় জুনিয়ার আইনজীবীরা যুক্ত সে সব মামলা চার সপ্তাহ পরে তালিকায় তুলতে বললেও ৬ মাস পরেও তালিকায় ওঠে না।

কোভিডের জন্য আপনাকেই প্রথম সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে ভার্চুয়াল ফেয়ারওয়েলের মধ্যে দিয়ে যেতে হল। ভার্চুয়াল জগত নিয়ে আদালতের কী শিক্ষণীয়?
কোভিড ছাড়াও আমাদের আরও বেশি প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া উচিত, যা আমরা নিই না। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যেসব মামলা বিচার পূর্ববর্তী পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলির ভিডিও কনফারেন্স করার পক্ষে এটা দারুণ সুযোগ। যেমন বিচারাধীনদের হেফাজতে রাখার মামলা ভার্চুয়ালি করাই যায়। ভিডিও কনফারেন্সিং বিচারপতিদের পক্ষেও ভাল। আইনজীবীদের অহেতুক নাটকীয়তাও কমবে।

বিচারপতি গগৈ সহ অনেক বিচারপতিই আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যে তাঁরা বিচারপতিদের ছোট করে দেখান। আপনি কি তাকেই নাটকীয়তা বলছেন?
কিছু আইনজীবী অবশ্যই রয়েছেন, যাঁরা রায় নিজেদের পক্ষে না গেলেই বিচারপতিদের সমালোচনা করেন। কেউ কেউ দাবি করেন তাঁদের বিচারবিভাগের উপর আস্থা নেই, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা আদালতে আসেন। এটা সর্বত্রই ঘটে। তবে আমি বিশ্বাস করি কেউ আদালতের সমালোচনা করেছে বলে তার কথা শোনা হবে না। আদালতে যাওয়ার অধিকার মৌলিক অধিকার।

বিচারবিভাগের সংস্কার নিয়ে আপনার উপদেশ কী?
আমার কাছে দুটো উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। একটা হল মামলা বিলম্বিত হওয়া ও আরেকটা নিয়োগ। পরিকাঠামো ভাল হলে বিলম্বিতকরণের বিষয়টা কাটিয়ে ওঠা যাবে। স্বাধীন বিচারবিভাগের জন্য আমাদের প্রয়োজন উচ্চ প্রশিক্ষিত ও সৎ বিচারপতি। নিয়োগ, আমি বলছি সমস্ত স্তরের নিয়োগ কেবলমাত্র মেধার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ